আপনার আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া হয়নি? এখন ই-রিটার্ন পোর্টালে প্রবেশ করে দেখছেন ৫,০০০ টাকা জরিমানা দেখাচ্ছে? তাহলে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রথমেই বুঝতে হবে, কেন এই জরিমানা দেখানো হচ্ছে, আইনে এর ভিত্তি কী এবং আপনার ক্ষেত্রে আদৌ এই জরিমানা প্রযোজ্য কি না।

বাংলাদেশে বর্তমানে অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিলের ব্যবস্থা চালু থাকায় অনেক করদাতা নিজেরাই e-Return সিস্টেম ব্যবহার করছেন। তবে নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন জমা না দিলে অনেকের মধ্যে জরিমানা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।
বিশেষ করে যাঁরা আগে কখনো আয়কর রিটার্ন জমা দেননি, যাঁদের আয় করযোগ্য সীমার নিচে, কিংবা যাঁরা শুধু e-TIN গ্রহণ করেছেন কিন্তু নিয়মিত রিটার্ন দাখিল করেননি—তাঁদের মধ্যে এই উদ্বেগ বেশি দেখা যায়।
এই লেখায় জানুন, ৫ হাজার টাকা জরিমানার আইনি ভিত্তি, কার ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য এবং এখন আপনার করণীয় কী।
তবে মনে রাখতে হবে, ই-রিটার্নে ৫,০০০ টাকা দেখালেই প্রত্যেক করদাতাকে এই পরিমাণ জরিমানা দিতে হবে, বিষয়টি এমন নয়।
বাংলাদেশের আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী কখন জরিমানা হতে পারে, কার ক্ষেত্রে কত টাকা প্রযোজ্য এবং এখন আপনার কী করা উচিত—চলুন সহজভাবে জেনে নেওয়া যাক।
১. রিটার্ন জমা না দিলে কেন ৫,০০০ টাকা জরিমানা হতে পারে?
বাংলাদেশের আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ২৬৬-এ নির্ধারিত সময়ে আয়কর রিটার্ন জমা না দেওয়ার জন্য জরিমানার বিধান রয়েছে।
কোনো ব্যক্তি আইন অনুযায়ী রিটার্ন জমা দিতে বাধ্য থাকা সত্ত্বেও যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া তা জমা না দিলে সংশ্লিষ্ট উপকর কমিশনার (Deputy Commissioner of Taxes) তাঁর বিরুদ্ধে জরিমানা আরোপ করতে পারেন।
আইন অনুযায়ী জরিমানার হিসাব সাধারণত নিম্নরূপ:
- সর্বশেষ নিরূপিত আয়ের ওপর ধার্যকৃত করের ১০ শতাংশ।
- জরিমানার সর্বনিম্ন পরিমাণ ১,০০০ টাকা।
- রিটার্ন জমা না দেওয়ার ব্যর্থতা অব্যাহত থাকলে প্রতিদিন অতিরিক্ত ৫০ টাকা জরিমানা হতে পারে।
তবে এই জরিমানার সর্বোচ্চ সীমা রয়েছে। তাই সবার ক্ষেত্রে একই অঙ্কের জরিমানা প্রযোজ্য নয়।
২. কার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫,০০০ টাকা জরিমানা হতে পারে?
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ২৬৬(১) অনুযায়ী ব্যক্তিশ্রেণির করদাতার ক্ষেত্রে জরিমানার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণে আগে তাঁর আয় নিরূপণ করা হয়েছে কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।
যাঁর আগে কখনো আয় নিরূপণ হয়নি:
এ ধরনের ব্যক্তিশ্রেণির করদাতার ক্ষেত্রে জরিমানার সর্বোচ্চ সীমা ৫,০০০ টাকা।
যাঁর আগে আয় নিরূপণ হয়েছে:
তাঁর ক্ষেত্রে জরিমানার সর্বোচ্চ সীমা হবে সর্বশেষ নিরূপিত আয়ের ওপর প্রদেয় করের ৫০ শতাংশ অথবা ১,০০০ টাকা—দুটির মধ্যে যেটি বেশি।
অর্থাৎ, প্রথমবার আয়কর রিটার্ন জমা দিতে গিয়ে কেউ ৫,০০০ টাকা জরিমানা দেখলেই ধরে নেওয়া যাবে না যে তাঁকে অবশ্যই এই টাকা দিতে হবে।
জরিমানা আরোপের ক্ষেত্রে আইনের শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, সেটিও দেখতে হবে।
৩. আয় করযোগ্য সীমার নিচে হলে কি জরিমানা দিতে হবে?
এটি অনেকের সাধারণ প্রশ্ন।
আপনার বার্ষিক আয় করমুক্ত সীমার নিচে থাকলেই যে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রয়োজন নেই, এমন ধারণা সঠিক নয়।
আয়কর আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির জন্য আয়কর রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক। কোনো ব্যক্তির করযোগ্য আয় না থাকলেও তাঁর ক্ষেত্রে রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে।
তবে দুটি বিষয় আলাদা করে বুঝতে হবে:
- রিটার্ন জমা দেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে কি না।
- রিটার্ন জমা না দেওয়ার কারণে জরিমানা আরোপের আইনি শর্ত পূরণ হয়েছে কি না।
আপনার আয় কম বা শূন্য হলে সেটি রিটার্নে সঠিকভাবে উল্লেখ করুন। আয় ও সম্পদের তথ্য গোপন না করে প্রকৃত আর্থিক অবস্থা তুলে ধরাই নিরাপদ।
৪. ই-রিটার্নে জরিমানা দেখালেই কি টাকা দিতে হবে?
না, শুধু পোর্টালে কোনো অঙ্ক প্রদর্শিত হওয়া এবং আইন অনুযায়ী জরিমানা আরোপের আদেশ দেওয়া এক বিষয় নয়।
ধারা ২৬৬ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট উপকর কমিশনার জরিমানা আরোপ করতে পারেন। অন্যদিকে, আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ২৮০-এ বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির শুনানি গ্রহণ বা তাঁকে শুনানির যুক্তিসঙ্গত সুযোগ না দিয়ে এই অংশের অধীনে জরিমানা আরোপের আদেশ দেওয়া যাবে না।
তাই আপনার অ্যাকাউন্টে জরিমানা দেখালে প্রথমে কয়েকটি বিষয় যাচাই করুন:
১. কোন করবর্ষের জন্য জরিমানা দেখানো হচ্ছে?
২. আপনার নামে আগে কোনো আয়কর নির্ধারণ হয়েছিল কি না?
৩. জরিমানার কোনো আনুষ্ঠানিক আদেশ বা নোটিশ রয়েছে কি না?
৪. কোন আইনি বিধানের ভিত্তিতে জরিমানার অঙ্ক নির্ধারণ করা হয়েছে?
৫. আপনার রিটার্ন দাখিল না করার পেছনে যুক্তিসঙ্গত কারণ ছিল কি না?
এসব তথ্য যাচাই না করে শুধু প্রদর্শিত অঙ্ক দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন না।
৫. এখন আপনার প্রথম কাজ কী হওয়া উচিত?
আপনার যদি আগের বছরের আয়কর রিটার্ন বকেয়া থাকে, তাহলে শুধু জরিমানার বিষয়টি নিয়ে বসে থাকবেন না। প্রথমে নিজের কর-সংক্রান্ত তথ্য গুছিয়ে নিন।
প্রথমত: e-TIN ও রিটার্নের ইতিহাস দেখুন
আপনার TIN কবে খোলা হয়েছে, আগে কোনো করবর্ষে রিটার্ন জমা দিয়েছেন কি না এবং পূর্ববর্তী কোনো কর নির্ধারণ রয়েছে কি না, তা যাচাই করুন।
দ্বিতীয়ত: বকেয়া করবর্ষ শনাক্ত করুন
কোন কোন বছরের রিটার্ন জমা দেওয়া হয়নি, তার একটি তালিকা তৈরি করুন। এতে আপনার প্রকৃত দায় ও করণীয় নির্ধারণ সহজ হবে।
তৃতীয়ত: জরিমানার হিসাব যাচাই করুন
জরিমানার পরিমাণ কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটি সংশ্লিষ্ট কর সার্কেল থেকে জেনে নিন। প্রয়োজনে জরিমানার আদেশের কপি সংগ্রহ করুন।
চতুর্থত: যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকলে বক্তব্য উপস্থাপন করুন
রিটার্ন জমা দিতে না পারার পেছনে অসুস্থতা, বিদেশে অবস্থান, প্রযুক্তিগত সমস্যা বা অন্য কোনো গ্রহণযোগ্য কারণ থাকলে সংশ্লিষ্ট উপকর কমিশনারের কাছে লিখিতভাবে তা তুলে ধরুন।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বা প্রমাণপত্র সঙ্গে দিন। তবে আবেদন করলেই জরিমানা মওকুফ হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে।
৬. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: চলতি করবর্ষের রিটার্ন এখনই জমা দিন
আগের বছরের রিটার্ন বকেয়া থাকলেও চলতি করবর্ষের রিটার্ন জমা দেওয়া থেকে বিরত থাকবেন না।
আমার পরামর্শ, আপনার বর্তমান করবর্ষের রিটার্নটি এখনই প্রস্তুত করে জমা দিন।
কারণ সময়মতো রিটার্ন জমা দিলে পরবর্তী জটিলতা এড়ানো সহজ হয়।
কোথায় রিটার্ন জমা দেবেন?
NBR-এর অফিসিয়াল ই-রিটার্ন পোর্টাল:
সেখানে আপনার TIN ও প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে নিবন্ধন করে রিটার্ন প্রস্তুত ও দাখিল করতে পারবেন।
চলতি করবর্ষে অধিকাংশ স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতার জন্য অনলাইনে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক। তবে আইনে নির্ধারিত কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে।
রিটার্ন জমা দেওয়ার পর অ্যাকনলেজমেন্ট স্লিপ (Acknowledgement Slip) এবং প্রয়োজনীয় কর সনদ ডাউনলোড করে সংরক্ষণ করুন।
৭. আগে কখনো রিটার্ন না দিলে কী করবেন?
যাঁরা প্রথমবার e-TIN খুলেছেন, তাঁদের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমে বুঝতে হবে, আপনার TIN থাকায় কোন কোন করবর্ষে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে।
এরপর:
- আপনার প্রকৃত আয় ও সম্পদের তথ্য সংগ্রহ করুন।
- কোন করবর্ষে রিটার্ন দেওয়া হয়নি তা চিহ্নিত করুন।
- বর্তমান করবর্ষের রিটার্ন আগে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জমা দিন।
- আগের বছরের বকেয়া রিটার্নের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর সার্কেলের নির্দেশনা নিন।
- জরিমানা আরোপ হয়ে থাকলে তার আইনগত ভিত্তি ও হিসাব যাচাই করুন।
একটি বিষয় মনে রাখবেন: বর্তমান করবর্ষের রিটার্ন জমা দিলেই আগের বছরের বকেয়া বা জরিমানা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে না। দুটি বিষয় আলাদাভাবে নিষ্পত্তি করতে হবে।
৮. রিটার্ন জমা না দিলে ভবিষ্যতে কী সমস্যা হতে পারে?
রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও তা উপেক্ষা করলে শুধু জরিমানার ঝুঁকি নয়, ভবিষ্যতে আরও কিছু অসুবিধা হতে পারে।
যেমন:
- নির্দিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি সেবা গ্রহণে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ প্রয়োজন হতে পারে।
- ব্যাংকিং ও আর্থিক কার্যক্রমে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
- ব্যবসায়িক লাইসেন্স, নিবন্ধন বা অনুমোদনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিতে সমস্যা হতে পারে।
- কর কর্তৃপক্ষের নোটিশ বা আইনগত কার্যক্রমের মুখোমুখি হতে পারেন।
তাই সমস্যা তৈরি হওয়ার অপেক্ষা না করে নিজের কর-সংক্রান্ত দায়িত্ব পালন করুন।
শেষ কথা
ই-রিটার্নে ৫,০০০ টাকা জরিমানা দেখাচ্ছে বলে ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। আবার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়াও ঠিক হবে না।
প্রথমে বুঝুন, আপনার ক্ষেত্রে রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল কি না। এরপর জরিমানার আইনি ভিত্তি যাচাই করুন এবং বকেয়া রিটার্নের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আগের বছরের সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি চলতি করবর্ষের বর্তমান রিটার্ন সময়মতো জমা দিন। এতে ভবিষ্যতে নতুন করে বিলম্বজনিত জটিলতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি কমবে।
আপনার আয় কম হোক বা বেশি, করযোগ্য আয় থাকুক বা না থাকুক—নিজের প্রকৃত আর্থিক তথ্য অনুযায়ী সঠিক রিটার্ন দাখিল করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
ReturnBD.com — আয়কর, ই-রিটার্ন ও কর আইন সম্পর্কে সহজ ভাষায় সঠিক তথ্য।
আইনি ও তথ্যসূত্র:
১. আয়কর আইন, ২০২৩ — ধারা ১৬৬, ১৭৩, ২৬৬ ও ২৮০।
২. জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) — Income Tax FAQ।
৩. NBR — Income Tax Act, 2023।
৪. অনলাইন রিটার্ন দাখিল — e-Return Portal।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই নিবন্ধটি সাধারণ কর-সচেতনতা ও তথ্য প্রদানের উদ্দেশ্যে লেখা। কোনো নির্দিষ্ট করদাতার জরিমানা বা করদায় নির্ধারণের জন্য তাঁর ব্যক্তিগত নথি ও সংশ্লিষ্ট আইনের বিধান পরীক্ষা করা প্রয়োজন।